একা একা বসে থাকলে আমি অনেক কিছু ভাবি।
নির্বিঘ্নে, নিঃশব্দে, নিজের ভেতরে ডুবে যাই। কখন যে সময় পার হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। মনে হয় যেন সময় নয়, জীবনটাই ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
জীবনে পরিশ্রম করেছি, চেষ্টা করেছি, সংগ্রাম করেছি—কিন্তু সফলতা আশানুরূপ আসেনি। যখন নিজের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে বসি, তখন সবচেয়ে বড় অপরাধী হিসেবে নিজেকেই পাই।
ভাবি—কেন আমার হাতে সুযোগ ছিল, বয়স ছিল, শক্তি ছিল, সাহস ছিল—তবুও আমি অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জনের পথে হাঁটিনি? কেন আমি নিজেকে বিরত রেখেছিলাম? কেন আমি সেইসব মানুষের মতো হতে পারিনি, যারা মিষ্টি কথার আড়ালে অন্যায়কারীদের সাথে হাত মিলিয়ে, ক্ষমতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে, একের পর এক সম্পদ গড়ে তুলেছে?
আজ যখন দেখি আমার সেই সময়ের বয়সী মানুষগুলো, তারা কীভাবে হাসিমুখে, মধুর আলাপচারিতায়, নানান সম্পর্কের ভান করে, সুবিধার জন্য নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে ধন-সম্পদে ভরে তুলেছে জীবন—তখন বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে।
আমি কি ভুল করেছিলাম?
অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন থেকে নিজেকে বিরত রাখা—এটা কি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল?
নাকি আমি ঠিকই ছিলাম?
এই প্রশ্নগুলো আমাকে আজও তাড়া করে বেড়ায়।
সমাজের বর্তমান চিত্র আমাকে আরও ভাবায়। এখানে যার অর্থ আছে, তার চারপাশে মানুষ আছে। যার অর্থ নেই, তার পাশে কেউ নেই।
না আপনজন, না আত্মীয়-স্বজন, না প্রতিবেশী, না বন্ধুবান্ধব—কেউ না।
প্রবাদটা কত নির্মম সত্য—
“যার অর্থ নেই, তার সাথে কেউ নেই।”
আমি সেটা নিজের জীবনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
কেউ খোঁজ নেয় না। কেউ জানতে চায় না কেমন আছি। যেন আমি বেঁচে আছি কি না, সেটাও কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কখনও কখনও মনে হয়—যে শ্বাসটা এখন চলছে, সেটাই যদি হঠাৎ থেমে যায়, তাহলে হয়তো খুব বেশি দিন কেউ আমাকে মনে রাখবে না।
হয়তো কিছুদিন পর নামটাও ভুলে যাবে সবাই।
এটাই স্বাভাবিক।
কারণ আমি অর্থহীন, লোভহীন, ক্ষমতা ব্যবহারহীন একজন সাধারণ মানুষ।
আজকের জীবনযাপনকে আসলে জীবন বলা যায় কি না, জানি না।
মনে হয় যেন জড় পদার্থের মতো শুধু ঠেলা খেয়ে এগিয়ে চলেছি। কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো বিশেষ চাওয়া নেই, শুধু দিন পার করার এক নিঃশব্দ প্রক্রিয়া।
এইভাবেই জীবন চলছে।
গত রাতেও এমন ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
স্বপ্নে দেখলাম—একটা ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস উঠেছে।
চারদিকে মানুষের হাহাকার, কান্না, চিৎকার।
সবকিছু ভেসে যাচ্ছে।
মানুষ দৌড়াচ্ছে, বাঁচার জন্য ছুটছে, কেউ কাউকে চিনছে না, কেউ কারও নয়।
আমিও হাঁটছিলাম এক অচেনা জায়গা দিয়ে।
নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছিলাম।
মনে হচ্ছিল—কোনো এক বিশাল বিপদ সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
স্বপ্নের ভেতরেও আমি সেই ভয়টা অনুভব করছিলাম।
চরম দুর্যোগ, চরম সংকট, চরম বিপদের এক অদ্ভুত সুর কানে বাজছিল।
ঘুম ভাঙার পরও সেই অনুভূতি আমাকে ছাড়েনি।
হয়তো এটা শুধু স্বপ্ন ছিল না—আমার ভেতরের বাস্তব ভয়ের প্রতিচ্ছবি ছিল।
আত্মীয়-স্বজন কখনোই আমাকে খুব একটা খোঁজখবর রাখেনি।
আমিও খুব বেশি চেষ্টা করিনি সম্পর্কগুলো ধরে রাখতে।
হয়তো আমারও ভুল ছিল।
আমি সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারিনি।
পরিবারের সাথে, আত্মীয়দের সাথে, বন্ধুদের সাথে—কোথাও নিজেকে পুরোপুরি ধরে রাখতে পারিনি।
ভালো কোনো পরিবারও গড়ে তুলতে পারিনি।
আজ আমি একা।
এই একাকীত্ব এখন আর কষ্টের জায়গা নয়—বরং অভ্যাসের জায়গা হয়ে গেছে।
ধীরে ধীরে এটা আমার পছন্দের জায়গা হয়ে উঠেছে।
নিজে বাজার করি।
নিজে রান্নাবান্না করি।
নিজের মতো করে ঘর গুছাই।
নিজেকেই নিজের সঙ্গী বানিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।
কখনও কখনও মনে হয়—মানুষ আসলে একাই জন্মায়, একাই বাঁচে, একাই চলে যায়।
মাঝখানের সম্পর্কগুলো শুধু সময়ের প্রয়োজন।
যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, মানুষও দূরে সরে যায়।
আমি কাউকে দোষ দিই না।
কারণ জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
শিখিয়েছে—প্রত্যাশা কম হলে কষ্টও কম হয়।
শিখিয়েছে—নিজের শান্তির জন্য কখনও কখনও একা থাকাই সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
শিখিয়েছে—সবাই আপন নয়, আর সব সম্পর্ক স্থায়ী নয়।
আজ আমি শুধু নিজের সাথে শান্তিতে থাকতে চাই।
অভিযোগ নেই, রাগ নেই, শুধু কিছু প্রশ্ন আছে—যেগুলোর উত্তর হয়তো কোনোদিন পাব না।
আমি কি সত্যিই ভুল ছিলাম?
সৎ থেকে, অন্যায় থেকে দূরে থেকে, লোভকে না বলে—আমি কি নিজের জীবনটাই কঠিন করে ফেলেছি?
নাকি শেষ পর্যন্ত এটাই আমার সবচেয়ে বড় সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল?
জানি না।
তবে এটুকু জানি—রাতে যখন একা বসে থাকি, তখন এই প্রশ্নগুলো আবার ফিরে আসে।
নীরবে বসে থাকে পাশে।
আর আমি শুধু তাকিয়ে থাকি জীবনের দিকে—একজন দর্শকের মতো।
এই গল্পটা একান্তই আমার নিজের বাস্তব জীবনের কথা।
হয়তো আপনার জীবনেও এর কিছুটা মিল আছে।
যদি থাকে, তাহলে জানাবেন।
হয়তো আমরা ভিন্ন মানুষ, কিন্তু একই গল্পের পথিক।
হয়তো আমাদের নীরবতাগুলো একে অপরকে বুঝতে পারে।
আপনার জীবনের গল্পটাও যদি শেয়ার করেন, তাহলে আমরা একাকীত্বের ভেতরেও এক ধরনের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি।
কারণ কখনও কখনও—
একই রকম কষ্টের মানুষগুলোই সবচেয়ে ভালোভাবে একে অপরকে বুঝতে পারে।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ । ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ শনিবার।