নড়াইলের শিক্ষা ও সংস্কৃতি অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আপসহীন কণ্ঠস্বর প্রফেসর মুন্সি হাফিজুর রহমান শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ঢাকাস্থ সমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহী, ছাত্র, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
তার মৃত্যুতে নড়াইলবাসী শুধু একজন শিক্ষককে হারায়নি; হারিয়েছে একজন অভিভাবক, একজন দিকনির্দেশক, একজন নৈতিক সাহসের প্রতীককে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, অধিকার আদায়, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে যিনি সারাজীবন আপসহীন থেকেছেন, সেই মানুষটির বিদায়ে আজ নড়াইল শোকাভিভূত।
প্রয়াত প্রফেসর মুন্সি হাফিজুর রহমান নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে ষাটের দশকের প্রথমদিকে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতার শুরু থেকেই তিনি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, মানবিকতা, শুদ্ধ ভাষা চর্চা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার এক অনন্য প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। একজন ভাষাবিদ হিসেবে শুদ্ধ ভাষা প্রয়োগে তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর বক্তব্য, উপস্থাপনা ও লেখনিতে ছিল ভাষার সৌন্দর্য, যুক্তির দৃঢ়তা এবং বিবেকের আহ্বান।
তিনি ছিলেন অটল অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক প্রধান ব্যক্তিত্ব। ধর্ম, বর্ণ, মত বা রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে মানবিক দর্শন, তা তিনি নিজের জীবন ও কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তিনি ছিলেন দৃঢ় অবস্থানের মানুষ। সমাজে বিভাজন, বিদ্বেষ কিংবা দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদের অন্যতম শক্তিশালী ভাষা।
নড়াইলের নদী ও বিল বাঁচাও আন্দোলনে তিনি দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরিবেশ রক্ষা, জনজীবনের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তিনি বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমান, ন্যায্য অধিকার, পরিবেশের ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক ভিত্তির সংরক্ষণ। তাই নদী রক্ষা আন্দোলনে তার সম্পৃক্ততা ছিল কেবল একটি কর্মসূচি নয়, বরং নাগরিক দায়িত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
দীর্ঘ বছর তিনি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তাই তিনি তরুণদের নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সুশাসনের পক্ষে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করতেন।
নড়াইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অভিভাবক হিসেবে তার অবদান ছিল অতুলনীয়। তিনি চিত্রা থিয়েটারের আজীবন সভাপতি ছিলেন এবং শিল্প-সাহিত্য-নাট্যচর্চার ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তার নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুধু বিনোদনের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক সচেতনতা, মুক্তচিন্তা এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
একুশে ফেব্রুয়ারির ‘লাখো মোমবাতি প্রজ্জ্বলন’ কর্মসূচির দীর্ঘদিনের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন। ভাষা শহীদদের স্মরণে তার এই উদ্যোগ ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার প্রকাশ। তিনি মনে করতেন, ভাষা হারালে জাতি তার আত্মাকে হারায়।
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান–এর প্রিয়ভাজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি শিল্প ও মানবতার গভীর বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। এস এম সুলতানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আদর্শ ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নড়াইলের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এই দুই ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি এক বিশেষ ইতিহাস তৈরি করেছে।
প্রফেসর মুন্সি হাফিজুর রহমান ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নড়াইলের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো অন্যায় ঘটলে তিনি নীরব থাকতেন না। প্রশাসনিক অব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্য, নাগরিক অধিকার হরণ কিংবা সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা সরব ছিলেন। তার উপস্থিতি মানুষকে সাহস দিত, তার পরামর্শ মানুষকে পথ দেখাত।
বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার এক বড় উৎস। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি তরুণ-তরুণীদের পাশে থেকেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, ভুল শুধরে দিয়েছেন এবং সাহস জুগিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে বদলাতে হলে তরুণদের সচেতন ও দায়িত্ববান হতে হবে। তাই তিনি শুধু উপদেশ দেননি, নিজ জীবনের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করেছেন।
শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় ঢাকা থেকে তার মরদেহ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। পরে এশার নামাজের পর রাত সাড়ে আটটায় নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের সুলতান মঞ্চ চত্বরে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, ছাত্র, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ পুষ্পমাল্য অর্পণ করে শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে স্থানীয় গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। অনেকেই অশ্রুসজল চোখে স্মরণ করেছেন তার অবদান, তার সাহস, তার মানবিকতা। কেউ বলেছেন তিনি ছিলেন শিক্ষক নয়, পিতৃতুল্য অভিভাবক; কেউ বলেছেন তিনি ছিলেন নড়াইলের বিবেক। তার চলে যাওয়া যেন একটি যুগের অবসান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তার কর্মময় জীবনের কথা স্মরণ করেন। অনেকে লিখেছেন—তিনি ছিলেন নড়াইলের সাংস্কৃতিক আত্মা, নৈতিক সাহসের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর। সবাই তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
প্রফেসর মুন্সি হাফিজুর রহমানের জীবন আমাদের শেখায়—একজন মানুষ চাইলে একটি জনপদের বিবেক হয়ে উঠতে পারেন। দায়িত্ববোধ, উন্নয়নচিন্তা, অধিকার আদায়ের সাহস, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
তার মৃত্যুতে নড়াইল আজ শোকাহত, কিন্তু তার আদর্শ, তার সংগ্রাম, তার উচ্চারণ এবং তার রেখে যাওয়া পথচিহ্ন আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে। তিনি নেই, কিন্তু তিনি থেকে যাবেন নড়াইলের ইতিহাসে, মানুষের স্মৃতিতে, সাংস্কৃতিক চেতনায় এবং ন্যায়বোধের প্রতিটি উচ্চারণে।